ইরানে অতি সম্প্রতি যে প্রতিবাদ–বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা দেশটির আগের প্রতিবাদচক্র থেকে স্পষ্টভাবেই আলাদা। অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হলেও, এই আন্দোলন দ্রুত রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে-যা ইরানের রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের গভীর ফাটলকে সামনে এনে দিয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দেশীয় মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রা সংকটই ছিল এর তাৎক্ষণিক কারণ। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনৈতিক অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান যুক্ত হওয়ায় স্পষ্ট হয়-এটি শুধু জীবিকার প্রশ্ন নয়, বরং শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থার গভীর সংকট।
এই প্রতিবাদের সূচনা হয় তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারকে কেন্দ্র করে। অতীতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তে এই বাজার ইরানের রাজনৈতিক উত্তাপে সূচক হিসেবে কাজ করেছে। দোকান বন্ধ, ধর্মঘট ও নীরব প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রথম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ডিসেম্বর ৩০–এর মধ্যে বিক্ষোভ তেহরানের বাইরে শিরাজ, ইসফাহান, আহভাজ, কেরমানশাহসহ বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে। একই দিনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানির অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি সামাজিক উত্তেজনা থেকে সরাসরি নিরাপত্তা সংকটে রূপ নেয়।
বৃহস্পতিবার (জানুয়ারি ৮) রাতে অন্তত ২১টি প্রদেশের ৪৬টি শহরে একযোগে বিক্ষোভ হয়। এতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়িকে লক্ষ্য করে সরাসরি স্লোগান দেয়া হয়, যা আন্দোলনের রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।
আরও পড়ুন: বিশ্বকে ১৫০ বার ধ্বংসের মতো অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের আছে, ট্রাম্প আমাদেরকে যেভাবে বোকা বানিয়েছে
এই বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রতিবাদকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এতে বিক্ষোভ ঘিরে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের প্রতিবাদ আগের সব আন্দোলনের চেয়ে ভিন্ন হয়ে উঠেছে মূলত এর সূচনাস্থল ও অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক অবস্থানের কারণে। অতীতে ইরানের বড় আন্দোলনগুলো কখনো মধ্যবিত্ত সংস্কারপন্থি ভোটার, কখনো প্রান্তিক নিম্নবিত্ত কিংবা তরুণ–নারীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবাদ শুরু হয়েছে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে-যা ঐতিহাসিকভাবে ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির প্রতীক।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবেও এই বাজার ছিল ক্ষমতার পালাবদলের অন্যতম কেন্দ্র। ফলে এবারের ক্ষোভ শুধু সমাজের প্রান্তে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রের ভেতরের মেরুদণ্ডে আঘাত হেনেছে, যা এই আন্দোলনকে আগের যেকোনো প্রতিবাদের তুলনায় বেশি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, অর্থনৈতিক ক্ষোভ খুব দ্রুত শাসনব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি ও বাজারে স্থবিরতা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ কয়েক দিনের মধ্যেই সরকারের সাময়িক নীতিগত সমাধানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। অতীতে ভর্তুকি বা আংশিক ছাড় দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও এবার সেই আস্থা আর কাজ করেনি। বরং স্লোগান ও বক্তব্যে স্পষ্টভাবে শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা তুলে ধরা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, একাধিক প্রদেশে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়িকে সরাসরি লক্ষ্য করে স্লোগান ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ লাল রেখা অতিক্রমের ইঙ্গিত দেয়, যা আগের আন্দোলনগুলোতে খুব সীমিতই দেখা গেছে।
এবারের প্রতিবাদকে আরও ভিন্ন করে তুলেছে রাষ্ট্রের ভেতরের বিভাজন ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব। একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সংলাপ ও সহনশীলতার বার্তা দিলেও অন্যদিকে বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমনের পথে হাঁটছে, যা ক্ষমতাকাঠামোর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। একই সময়ে ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনা, গাজা যুদ্ধ–পরবর্তী বৈশ্বিক মেরুকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই বহুমাত্রিক চাপের মধ্যে বাজারের ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী মানুষের একসঙ্গে রাস্তায় নামা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এবারের আন্দোলন আর কোনো একক শ্রেণি বা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি ইরানি সমাজে জমে থাকা আস্থাহীনতার একটি বিস্তৃত ও গভীর বিস্ফোরণ।
দেশটির ভেতরে নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়াতেও এক ধরনের বিভক্ত দেখা গেছে। খামেনেয়ি ও বিচার বিভাগ কঠোর অবস্থান নিলেও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক সংযত ও সহনশীল ভাষায় উত্তাল পরিস্থিতি সামাল দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বাস্তবে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকায় এই সংযত বক্তব্যের প্রভাব সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সময়ে সামাজিক ধৈর্য দ্রুত ক্ষয়, রাজনৈতিক অভিজাতদের ভেতরের বিভাজন এবং সংস্কারের প্রতি আস্থাহীনতা-এই তিনটি বিষয় মিলেই ইরানকে নতুন এক অস্থিরতার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিবাদ কোনো সাময়িক অস্থিরতা নয়, আবার তাৎক্ষণিক রাষ্ট্রভাঙনের লক্ষণও নয়; তবে সামনে আরও নাজুক এবং ঘোলাটে সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।







