দেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ এবং এ-সংক্রান্ত মৃত্যুহার কমাতে সরকার ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) কারিগরি সহায়তা এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে গঠিত ‘অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সমন্বয় কমিটি’র প্রথম উচ্চপর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ
সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণে।
এ ছাড়া, এসব রোগে মৃত্যুবরণকারীদের প্রায় অর্ধেকই ৭০ বছরের আগেই প্রাণ হারাচ্ছেন, যা অকাল মৃত্যুর হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অসংক্রামক রোগের অর্থনৈতিক প্রভাবও উদ্বেগজনক। দেশে স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ রোগীদের নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যার বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি এসব রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হয়।
১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা অংশ নেন। সভায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে আগামী এক থেকে তিন মাসের মধ্যে নিজ নিজ খাতভিত্তিক সময়সীমা নির্ধারিত ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি বা ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ
সরকার ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ (Health in All Policies) নীতিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আওতায় ভবিষ্যতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, নীতি প্রণয়ন ও মানবসম্পদ পরিকল্পনায় অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে শিক্ষা খাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কায়িক পরিশ্রমে উৎসাহিত করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে তাদের কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, যা নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে।
‘চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ অধিক কার্যকর’
সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ সরকারের এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, শুধু চিকিৎসা ও ওষুধনির্ভর ব্যবস্থা দিয়ে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত হাঁটাচলা, কায়িক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব রোগ প্রতিরোধে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ অধিক কার্যকর। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারলে অসংক্রামক রোগের ভয়াবহতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

