বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে আরও আধুনিক, দূরদর্শী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার পর্যায়ক্রমে সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বুধবার (১০ জুন) ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রতিবছর ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হলেও এবার পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির কারণে বাংলাদেশে ১০ জুন দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।
বক্তব্যের শুরুতে শহীদ শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা শুধু দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নয়, জাতিসংঘের পতাকাতলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায়ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তিনি আরও বলেন, প্রতিকূল পরিবেশ, সীমাবদ্ধতা ও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৌরব ও সুনাম অর্জন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের দুই লাখের বেশি সদস্য বিশ্বের ৪৩টি দেশের প্রায় ৬৩টি শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৮৬০ জন বাংলাদেশি ১০টি মিশনে কর্মরত রয়েছেন এবং হাইতিতে নতুন একটি মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্য যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে প্রতিকূল পরিবেশে নিষ্ঠা, সাহস ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য জাতি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
অনুষ্ঠানে ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান তুলে ধরা হয়। এছাড়া শহীদ শান্তিরক্ষীদের পরিবার এবং আহত সদস্যদের সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা, সম্মান ও সাহসের প্রতীক উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক এবং সেনাবাহিনীর একজন মেজর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এই গৌরব রক্ষা করা সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে নানা অপতৎপরতা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তীতেও বিভিন্ন সময়ে বাহিনীর ঐক্য নষ্টের চেষ্টা হয়েছে।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বড় আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই ঘটনার পরিণতি দেশের মানুষ জানে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পেশাদারিত্ব, ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড ছাড়া কোনো ইউনিফর্মধারী বাহিনীর সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা সম্ভব নয়।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে নিজেদের আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দেশে বা বিদেশে যে দায়িত্বই পালন করা হোক না কেন, তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করাই সবার অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কারণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে আরও আধুনিক, দূরদর্শী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই সরকার সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সংবিধানে বর্ণিত বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক সহাবস্থান ও ন্যায়বিচারের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অটুট রয়েছে। দেশ সব সময় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদার নীতিতে বিশ্বাসী এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশের সদস্যরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার মাধ্যমে দেশের মর্যাদা আরও সমুন্নত করবেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

