ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারিতে (এনআইবিপিএস) অস্তিত্বহীন একটি পদ সৃষ্টি করে মো. তোফায়েল আহমেদ দীপু নামে এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়, টেন্ডার, আউটসোর্সিং নিয়োগ, সরকারি সম্পদের ব্যবহার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দীপু মূলত গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ পেলেও বর্তমানে তিনি পরিচালকের ‘ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস-২)’ পরিচয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে ইনস্টিটিউটের অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় এ ধরনের কোনো পদ নেই। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালকের স্বাক্ষরিত একটি আদেশের মাধ্যমে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—যে পদ সরকারি কাঠামোতেই নেই, সেই পদ সৃষ্টি করে কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হলো?
অভিযোগকারীদের দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়া, আউটসোর্সিং নিয়োগ, বিভিন্ন ক্রয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দীপু কার্যত প্রভাব বিস্তার করেন। মাসিক প্রায় ১৯ হাজার টাকা বেতনের একজন কর্মচারী হয়েও তিনি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৬-৭৪১৪ নম্বরের একটি মিতসুবিশি এক্সপান্ডার তার মালিকানাধীন।
এদিকে, পরিচালকের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বে থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বার্ন ইনস্টিটিউটের রোগীদের একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, “আমি বার্ন ইউনিট ছাড়া কোনো হাসপাতালের পরিচালক না। এখন সামনে রোগী আছে, পরে কথা বলব।” পরে আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “২১ জুলাই পর্যন্ত ব্যস্ত আছি। এরপর অফিসে এসে কথা বলুন।”
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সম্প্রতি দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন প্রতিটি ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা দামে কেনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দাবি, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ একই যন্ত্রের সর্বোচ্চ মূল্য ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে হওয়া উচিত। তাদের অভিযোগ, বাজারদরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন দরপত্রে বার্ন চিকিৎসায় প্রয়োজন নেই—এমন পণ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে পণ্য কেনা, অস্বাভাবিক চাহিদা নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে টেন্ডারের স্পেসিফিকেশন সাজানোর অভিযোগও রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রাশেদ রাব্বি বলেন, “যে পণ্যের প্রয়োজন নেই, তা দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এ ধরনের ঘটনা নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।”
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৪০ কোটি টাকার সরবরাহ আদেশের বিপরীতে নির্ধারিত সময়ে মাত্র ১৭ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করা হলেও অর্থবছর শেষে অবশিষ্ট ২৩ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। পরে আংশিক সরবরাহ এলেও এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য হাসপাতাল পায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, দীপু সরকারি কোনো অনুমোদিত পদে না থেকেও নিয়োগ, কেনাকাটা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং কর্মচারী নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি অফিস কক্ষ, ডেস্ক ও কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সুবিধাও তাকে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পরিচালকের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগত স্মোকিং রুম ব্যবহার, বিদেশ সফরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির পণ্য ব্যবহারে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, সংশ্লিষ্ট সব ক্রয় কার্যক্রমের নিরীক্ষা, দীপুর নিয়োগের বৈধতা যাচাই এবং অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন করে লিখিত আবেদন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এদিকে, একাধিক চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে,

তিনি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং সে সময় প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন।


